Print Print

উচ্চ আদালতের দেয়া সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল

সারাদিন ডেস্ক:: ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে এডিসসহ সকল প্রকার মশা নিধনে রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনকে উচ্চ আদালতের দেয়া ৪ দিনের সময় শেষ হচ্ছে আগামীকাল। উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর বেশ কিছু স্থানে মশা মারতে দুই সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে বিশেষভাবে কাজ করতে দেখা গেলেও বেশিরভাগ স্থানের ক্ষেত্রেই মশা মারতে সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হতে দেখা যাচ্ছে। দুই মেয়রের মতে, পুরনো অনেকটা অকার্যকর ওষুধ দিয়েই চলছে মশা নিধনের কাজ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্তৃপক্ষের মশক নিধন শাখার দায়িত্বরত কর্মকর্তাগণ বলছেন আদালতের নির্দেশ তারা বাস্তবায়ন করছেন। তবে মাঠ পর্যায়ে ঘুরে এসে ও বিশেষ কর্মকান্ডের মাধ্যমে গৃহীত কর্মকান্ডের অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, উচ্চ আদালতের দেয়া সময়ের মধ্যে ওষুধের ডোজ বাড়িয়েও কোনক্রমেই মশা নিধন করতে পারছে না দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। এমনকি তা করতেও সক্ষম নয় দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। কারণ হিসেবে দেখা গেছে, এ নির্দিষ্ট সময়ে আদেশ বাস্তবায়নের জনবল ও পর্যাপ্ত কার্যকরী ওষুধই নেই রাজধানীর নাগরিকদের সেবাদানকারী সংস্থা দুটির। উচ্চ আদালতের কঠোর নির্দেশনার পরও অন্য সকল সময়ের মতোই মশা মারতে ক্রাশ প্রোগ্রাম গ্রহণ, জনসচেতনতা তৈরিতে নানা পদক্ষেপ আর আলোচনা সভাই করে যাচ্ছে দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। আগামী মঙ্গলবার এ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উচ্চ আদালতে মশক নিধনে কি কি প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়েছে তার তালিকাও জমা দিতে নির্দেশ দিয়েছে উচ্চ আদালত।

গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের ব্যবহার করা ওষুধের সমালোচনা করে হাইকোর্ট। বিচারপতি তারিকুল হাকিম ও বিচারপতি সোহরাওয়ার্দীর সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এক শুনানিতে এসব কথা বলেন। গত সোমবার ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়াসহ অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে জমা দেয়া প্রতিবেদনে আদালত সন্তোষ না হওয়ায় দুই সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তলব করে হাইকোর্ট। এর পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার আদালতে হাজির হন ঢাকার দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডাঃ মোঃ শরীফ আহমেদ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন।

তবে দুই সিটির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, মশা মারতে প্রয়োজনীয় যা করণীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতা দিয়ে সে চেষ্টাই করা হচ্ছে। সিটি কর্পোরেশনের পক্ষ থেকে সংস্থাটির সর্বোচ্চ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য শাখার সকল কর্মীদের ছুটি বাতিল করে মাঠে নেমেছেন। এছাড়া নানা উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে বলে দাবি করছেন দায়িত্বপ্রাপ্তরা।

অবস্থাদৃষ্টে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মশা মারতে বিশেষ কোন অগ্রগতি সম্ভব হবে না বলেই সিটি কর্পোরেশনের কার্যক্রমে পরিলক্ষিত হচ্ছে। জনবল সঙ্কট, পর্যাপ্ত ও কার্যকরী ওষুধের ব্যবস্থা না থাকা, মশক নিধন কর্মীদের কাজে উৎসাহ না থাকা, বাড়ি বাড়ি ঘুরে ওষুধ না ছিটানো, একইসঙ্গে বাড়ির মালিকদের বাড়ির ভেতরে ওষুধ ছিটাতে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করা সহ নানা কারণেই মশা মারতে পারছেন না বা ব্যর্থ হচ্ছেন মশক নিধন কর্মী ও স্বাস্থ্য শাখার কর্মকর্তা কর্মচারীরা।

২৫ জুলাই উচ্চ আদালত থেকে পরবর্তী চার দিনের মধ্যে মশা মারতে প্রয়োজনীয় কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় আদালত। মশার ওষুধ ছিটাতে প্রয়োজনের তুলনায় ডোজ দ্বিগুণ বা চারগুণ বাড়িয়ে কিংবা মশাকে সম্পূর্ণভাবে নিধন করতে প্রয়োজনীয় যা যা করার তাই করতে দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে আদালতে তলব করে এই ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয় আদালত। এর আগেও উচ্চ আদালত দুই সিটি কর্পোরেশনের কর্তৃপক্ষকে মশা মারতে কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে ২৪ ঘণ্টা সময় বেধে দেয় সর্বোচ্চ আদালত। কিন্তু ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও তা কোনক্রমেই আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে পারেনি ঢাকার ২ সিটির স্বাস্থ্য শাখা। এরপর উচ্চ আদালত পূর্বের দেয়া সময়ের ব্যর্থতা জানতে চেয়ে দুই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে আদালতে ডেকে নতুন করে আবারও ৪ দিন সময় ধার্য করে দেয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, আদালতের এমন কঠোর নির্দেশের পরও মশক নিধন কর্মীদের রাস্তায় মশার ওষুধ ছিটাতে তেমন কারোরই চোখে পরছে না। যেসব এলাকায় ওষুধ ছিটানো হচ্ছে তাও নামকাওয়াস্তে। বেশিরভাগ এলাকায় দিন কিংবা রাতের কোন সময়ই কোন মশক নিধন কর্মীদের মশার ওষুধ ছিটাতে দেখছে না নাগরিকগণ। উপরন্তু দিন দিন ব্যাপক হারেই বাড়ছে এডিস মশার কামড়ে আক্রান্ত ডেঙ্গু জ্বরের রোগীর সংখ্যা। সরকারী বেসরকারী সকল হাসপাতাল ক্লিনিকে ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগী ভর্তি করার মতো কোন ঠাঁই পর্যন্ত নেই। অনেকে বাধ্য হয়ে বাসায় বসেই জ্বরের চিকিৎসা গ্রহণ করছেন। কেউ বা জ্বরে আক্রান্ত হয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাও গ্রহণ করতে পারছেন না।

উচ্চ আদালতের বেঁধে দেয়া সময়ের নির্দেশনা বাস্তবায়নে কি কি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ শরীফ  বলেন, উচ্চ আদালতের রায়ের পরিপূর্ণ বাস্তবায়নে আমরা যথেষ্ট গুরুত্বের সঙ্গেই একটানা কাজ করছি। আদালতের নির্দেশের পরই আমরা বেশ জোরে শোরেই মাঠে নেমেছি। শুক্রবার থেকে আমরা নতুন করে মশা মারতে ক্রাশ প্রোগ্রাম বাস্তবায়নে মাঠে নেমেছি। শুক্রবার ধানমন্ডি জোনের প্রতিটি ওয়ার্ডে মশা মারতে ক্রাশ প্রোগ্রাম পরিচালনা করা হয়েছে। মশক নিধনে ডিএসসিসির স্বাস্থ্য শাখার সকল কর্মকর্তা কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে কাজ করছি। শনিবার আমরা খিলগাঁও জোনের অধীনে ১২টি ওয়ার্ডে একযোগে সারাদিন মশা মারতে ক্রাশ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করছি। খিলগাঁওয়ের স্থানীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে এ প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করছি। মোটকথা মশা মারতে ডিএসসিসির ৫৭টি ওয়ার্ডেই প্রয়োজনীয় যা করণীয় তাই করে যাচ্ছি। তিনি বলেন, পূর্বে আমরা যেসব নির্মাণাধীন বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা রয়েছে তা ধ্বংস করতে চিঠি দিয়েছিলাম সেসব ভবনের মালিকগণ যারা এতে সাড়া দেয়নি তাদের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা আদায় করছি ও লার্ভা ধ্বংস করছি। নির্দিষ্ট সময়ে আদেশ বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা আমাদের সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমে কাজ করছি।

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোমিনুল হক বলেন, আদালতের নির্দেশের পর আমরা বেশ জোরেশোরেই মশক নিধনে প্রয়োজনীয় সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। মশা নিধনে নাগরিকগণকে সঙ্গে নিয়ে ও ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের সহযোগিতায় একযোগে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সবাইকে নিয়ে কাজ করছি। আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত বৃহস্পতিবার উচ্চ আদালত ওষুধের ডোজ বাড়িয়ে এডিস মশা নির্মূলে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনকে আগামী মঙ্গলবার পর্যন্ত সময় নির্ধারণ করে দেয়। একইসঙ্গে এই সময়ের মধ্যে ওষুধ ব্যবহারে মশা নিধন হয়েছে কিনা সে বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতেও নির্দেশ দেয়া হয়। রাজধানীর মশা নিধনে দুই সিটি কর্পোরেশনের ব্যবহার করা ওষুধের সমালোচনা করে হাইকোর্ট বলেছে, সাধারণ মানুষও এই ওষুধকে বিশ্বাস করতে পারছে না বলে মনে করেন আদালত। ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না কেন ? গতবছর ওষুধ ছিটালে ঘরেও তার ঝাঁজ পেতাম। এবার গন্ধও পাওয়া যায় না। এর জবাবে মশা নির্মূলে আগামী চারদিন সমন্বিত অভিযান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়ার কথাও বলেছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন। আগামী মঙ্গলবার পরবর্তী দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে ডেঙ্গু পরীক্ষায় বেসরকারী হাসপাতালগুলো অতিরিক্ত ফি নিচ্ছে কিনা এবং সরকারী হাসপাতাল ফ্রি করাচ্ছে কিনা তা জানতে চেয়েছে হাইকোর্ট। ২৯ জুলাইয়ের মধ্যে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর কাছে এ তথ্য জানতে চেয়েছে। বৃহস্পতিবার হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চগুলো এ আদেশ প্রদান করে। আদালতে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে আইনজীবী ছিলেন তৌফিক ইনাম টিপু এবং দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী সাঈদ আহমেদ রাজা। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন এ্যাটর্র্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি এ্যাটর্নি জেনারেল কাজী মাঈনুল হাসান ও সহকারী এ্যাটর্নি জেনারেল সায়েরা ফায়রোজ।

এ সময় আদালত এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমের উদ্দেশে বলেন, এ বছর এ্যালার্মিং সিচ্যুয়েশন কেন হলো? এক্ষেত্রে কী সমস্যা, তা কি চিহ্নিত করেছেন? জবাবে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, চিন্তা করতে হবে। নিঃসন্দেহে বিষয়টা সবার হেলথ কনসার্ন। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনই বলুক, সেটাই ভাল হয়। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, আমার এই সিটি কর্পোরেশনে এক কোটির বেশি লোক। আর ১০টি জোনে ৭৫টি ওয়ার্ডে মশক নিধন কার্যক্রমে জনবল মাত্র ৪২৯। তখন আদালত বলে, এ বছর ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এত কেন? জবাবে তিনি বলেন, এটা একটা বৈশ্বিক সমস্যা। ক্লাইমেট সেনসেটিভ ডিজিজ। আর এ বছর আমাদের দেশে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, সর্বোচ্চ আর্দ্রতা ও সর্বোচ্চ উষ্ণতা ছিল। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এমনটা হচ্ছে। দক্ষিণ এশিয়ায় এর ভয়াবহ প্রভাব চলছে। সব দেশেই তো ডেঙ্গু আছে।’ এ সময় তিনি কয়েকটি দেশের ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা তুলে ধরেন। আদালত বলে,ওষুধ কার্যকর হচ্ছে না কেন? গতবছর ওষুধ ছিটালে ঘরেও তার ঝাঁজ পেতাম। এবার গন্ধও পাওয়া যায় না। জনগণের ধারণা হচ্ছে এবারের ওষুধে কাজ হচ্ছে না। টিভিতে দেখলাম সড়কমন্ত্রী বললেন, এবারের ওষুধ কাজ করছে না। এর আগে তো কেউ স্বীকারই করেনি। তখন স্বাস্থ্য কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা যখনই ওষুধ আনি তখনই সরকারী দুটি ল্যাবে টেস্ট করে পজেটিভ সার্টিফিকেট পেলেই ব্যবহার করি। অর্থাৎ ল্যাব পরীক্ষায় সন্তোষজনক বললে ব্যবহার করি।

এরপর উত্তর সিটি কর্পোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ মোমিনুর রহমান মামুন বলেন, আমরা পুরো ওষুধটাই চেঞ্জ করব। এজন্য একটি কারিগরি কমিটি করেছি। সমস্যা হচ্ছে, পিপিপি’র মাধ্যমে এটা করতে হয়। সেখানে অনেক সময় লাগে। তবে ডিপিএম’র মাধ্যমে কিনলে তাড়াতাড়ি পেয়ে যাব। এ প্রক্রিয়ায় কতদিন সময় লাগবে আদালত তা জানতে চাইলে স্বাস্থ্য কর্মকর্তা এ বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা চান। তখন আদালত বলেন, এক সপ্তাহের মধ্যে ওষুধ আনবেন। আমরা আদেশ দেব। আমরা ওষুধ চাই। কী প্রক্রিয়ায় আনবেন সেটা হলফনামা আকারে আপনার আইনজীবীকে দিতে বলেন।

ADs by sundarban PVC sundarban PVC Ads

ADs by Korotoa PVC Korotoa PVC Ads
ADs by Bank Asia Bank 

Asia Ads

নিচে মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *