Print Print

নুসরাত হত্যা নিয়ে যা জানাল পিবিআই

নিজস্ব প্রতিবেদক::ফেনীর সোনাগাজীতে মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনায় বোরকা পরিহিত পাঁচজনই ছিল ওই মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে তিনজন ছাত্র ও দুইজন ছাত্রী। আগুন লাগানোর পর তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিতে নিচে পাহারায় ছিল আরও পাঁচজন। গোটা ঘটনায় সম্পৃক্ত ছিল ১৩ জন।

ঘটনায় জড়িত এক ছাত্রীর দায়িত্ব ছিল চারটা বোরকা জোগাড় করা। আরেকজনকে দায়িত্ব দেওয়া হয় কেরোসিনের। সেগুলো জোগাড় করে মাদ্রাসার ছাদের বাথরুমে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে কৌশলে নুসরাতকে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এসবের নির্দেশ দেয় নুসরাতের করা মামলায় কারাগারে থাকা অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলা। আর সে নির্দেশ অনুযায়ী পুরো ঘটনার পরিকল্পনা করা হয়।

শনিবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) হেড কোয়ার্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানায়। ঘটনার আদ্যোপান্ত ব্রিফিং করেন পিবিআইয়ের ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার।

সিরাজের নির্দেশে নুসরাত হত্যার পরিকল্পনা

পিবিআই জানায়, অধ্যক্ষ জেলে যাওয়ার পর ৪ এপ্রিল তার সঙ্গে কারাগারে দেখা করে আসেন মাদ্রাসাটির ছাত্র নুর উদ্দিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থী। অধ্যক্ষ তাদেরকে জিজ্ঞেস করে- তোমরা আমার জন্য কি করেছ? এদিন সিরাজ নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার নির্দেশনা দেয় বলে নুর উদ্দিন স্বীকার করেছে।

হুজুরের নির্দেশ পালন করতে নুর উদ্দিনসহ পাঁচজন মিলে পরিকল্পনা করে। পরিকল্পনার কথা মাদ্রাসার চারজন শিক্ষার্থীকে জানানো হয়। সে অনুযায়ী চারটি বোরকা ও কেরোসিন জোগাড় করে দুইজন ছাত্রী। ৬ এপ্রিল সকালে নুসরাত আলিম পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় যায়।

এসময় এক ছাত্রী তাকে মাদ্রাসার ছাদে নিয়ে যায়। আগে থেকে ছাদের বাথরুমে থাকা তিনজন তার গায়ে কেরোসিন ছিটিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত এক শিক্ষার্থী নিচে এসে নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার কথা সকলকে বলে।

সকলে যখন নুসরাতকে উদ্ধার করতে যান তখন ছাদে থাকা তিন শিক্ষার্থী বোরকা পরা অবস্থায় নিচে নেমে ভিড়ের মধ্যে মিশে যায়। তারা যেন নিরাপদে সরে যেতে পারে সেজন্য মাদ্রাসার নিচের গেটে পাঁচজন তাদের সাহায্য করে।

ঘটনায় জড়িত ১৩ জন, আগুন দেয় ৪ জন

পিবিআই বলছে, অধ্যক্ষ সিরাজ উদ-দৌলার নির্দেশ মতো নুসরাতকে আগুনে পোড়ানো হয়। আগুন দেয় মাদ্রাসারই চার শিক্ষার্থী। তার মধ্যে তিনজন ছাত্র আরকেজন ছাত্রী। তাদেরকে চিহিৃত করা হয়েছে। এক ছাত্রীকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। ঘটনার তদন্তে নেমে পিবিআই এখন পর্যন্ত আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে। আর ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ততা মিলেছে ১৩ জনের।

নুসরাতকে হত্যার দুই কারণ

২৭ মার্চ নুসরাত জাহান রাফিকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজদ্দৌলাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এরপর তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়।

পিবিআই প্রধান বলেন, ‘নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার দুটি কারণ জানিয়েছে নুর। এর মধ্যে একটি অধ্যক্ষকে জেলে পাঠিয়ে আলেম ও মাদ্রাসা শিক্ষককে হেয় করা। অন্যটি প্রেমের প্রস্তাব প্রত্যাখান। শাহাদাত হোসেন শামীম নামে এক বখাটে নুসরাতকে প্রতিনিয়ত প্রেমের প্রস্তাব দিত। কিন্তু নুসরাত সেটি বারংবার প্রত্যাখান করেছিল।’

‘দুর্বৃত্তরা ভেবেছিল- এর আগে একবার নুসরাতের চোখে চুন নিক্ষেপ করেও কোনও কিছু হয়নি। এবার পুড়িয়ে হত্যা করলেও কিছু হবে না।’

পিবিআই গোটা ঘটনার উৎঘাটন করতে পেরেছে এবং আরও তদন্ত চলছে জানিয়ে যত বড় কেউ এই ঘটনায় থাকুক তাকে আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানান পিবিআই প্রধান।

এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার যারা

নুসরাতকে পেুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় তার ভাইয়ের করা মামলার এজাহারভুক্ত সাতজন গ্রেপ্তার আছে। তারা হলো- মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌলা, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন ও শাহাদাত হোসেন শামীম এবং পৌর কাউন্সিলর মাকসুদ আলম, জোবায়ের আহম্মেদ, জাবেদ হোসেন ও আফসার উদ্দিন। এজাহারে নাম উল্লেখ থাকা হাফেজ আবদুল কাদের পলাতক। বাকি পাঁচজনকে গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

অন্যদিকে এ ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার ছয়জন হলো- কেফায়েত উল্লাহ জনি, সাইদুল ইসলাম, আরিফুল ইসলাম, অধ্যক্ষের ভাগি উম্মে সুলতানা পপি, নূর হোসেন ও আলাউদ্দিন।

ফ্ল্যাশব্যাক

সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ছাত্রী নুসরাত এবছর আলিম পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছিলেন। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এসএম সিরাজ উদ-দৌলার বিরুদ্ধে ‘শ্লীলতাহানির’ অভিযোগ এনে গত মার্চে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা করে নুসরাতের পরিবার।

সেই মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের পক্ষ থেকে বারবার চাপ দেওয়া হচ্ছিল। তবে মামলা তুলে না নেওয়ায় অধ্যক্ষের অনুসারীরা গত শনিবার পরীক্ষার কেন্দ্র থেকে কৌশলে ডেকে নিয়ে নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এদিন রাতেই ঢামেক হাসপাতালের ভর্তি করা হয়। অবস্থা সংকটাপন্ন হওয়ায় সোমবার তাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হয়। গত বুধবার রাতে নুসরাতের মৃত্যু হয়।

শরীরে ৮০ ভাগ পুড়ে যাওয়া নুসরাতকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিলেও শারীরিক অবস্থার কারণে তা সম্ভব হয়নি। দেশজুড়ে আলোচিত নুসরাতের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী এ ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন।

ADs by sundarban PVC sundarban PVC Ads

ADs by Korotoa PVC Korotoa PVC Ads
ADs by Bank Asia Bank 

Asia Ads

নিচে মন্তব্য করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *