সংবাদ শিরোনাম
তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে দাম্পত্য কলহের জেরে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর মৃত্যু, স্বামী পলাতক সাংবাদিকতার চাইতে চ্যালেঞ্জিং পেশা আর নেই-মির্জা ফখরুল পীরগঞ্জ প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নির্ধারিত ৫শ৪৬ খামারীর মাঝে পশুখাদ্য ও উপকরণ বিতরণ পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদে এমপি’র অফিস উদ্বোধন পীরগঞ্জে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে স্থানীয় এমপি;র মত-বিনীময় সভা অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ে আল-হাসানাহ স্কুলের ১ম ত্রৈ-মাসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত পীরগঞ্জে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার খাল-খনন প্রকল্পের উদ্বোধন পীরগঞ্জে পূর্ব চৌরাস্তা ব্যাবসায়ী সমিতি নির্বাচন-রব্বানী সভাপতি, রাজা সম্পাদক পীরগঞ্জে সিসি ক্যামেরার আওতায় নকলমুক্ত পরিবেশে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত

নববর্ষ কার?

মনদ্বীপ ঘরাই

প্রশ্নটা শিশুতোষ মনে করতেই পারেন। আমার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ইদানিং নববর্ষ উদযাপনকে নানান ট্যাগে ভূষিত করছেন। ধর্মীয় বা রাজনীতিক আলোচনায় যাব না সঙ্গত কারণেই। শুধু সমাজ আর ইতিহাসে চোখ রাখলেও প্রশ্নটার ব্যবচ্ছেদ করে একটা উত্তর ঠিকই বের করে আনা যাবে।

ইতিহাসের কাটখোট্টা আলোচনা করে উৎসবের এই সময়টাতে ঘুম পাড়াতে চাই না। বরং জীবন আর চারপাশের সাথে ইতিহাস মিশিয়ে এগুলে একটু সুখকর হবে।

সবাই তো ইতিহাস থেকে বর্তমানে যায়। আমরা বরং উল্টোটা করি। বর্তমান থেকে ইতিহাসের পাতায় ঢুকি।

বর্তমান সময়টাতে ব্র্যান্ডিং জেঁকে বসেছে নববর্ষের ঘাড়ে। বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাদের অফার নিয়ে হাজির। এটাকে আপনারা কি বলবেন জানি না, তবে আমি শুভ চোখেই দেখছি। নতুন কাপড়, বাঙলি খাবার থেকে শুরু করে নববর্ষের ছবি ও গান; সব নিয়ে চলছে ব্র্যান্ডিং। ছবি ও গানের বিষয়টা খুলেই বলি। একটা বহুল পরিচিত কোম্পানি উদ্যোগ নিয়েছে ইন্টারনেট দুনিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য উৎসবের মতো নববর্ষকেও বহুল পরিচিত করতে। নিঃসন্দেহে শুভ উদ্যোগ। সেই সাথে তাদের প্রোডাক্ট প্রমোশনটাও হয়ে গেল। আর নববর্ষের আত্মার আত্মীয় “এসো হে বৈশাখ” গানটাকেও এবারের নববর্ষে দারুন ব্র্যান্ডিং করেছে বহুজাতিক একটি কোমল পানীয় কোম্পানি। বাদ্যযন্ত্রের জায়গা নিয়েছে তাদের পানীয়ের বোতল। সুপার শপগুলোতে গেলেই চোখে পড়বে নানান মিষ্টি আর পিঠা দিয়ে সাজানো কুলো। সেদিন আমার ছোট্ট পত্রিকা কাদামাটির প্রকাশনার কাজে প্রেসে থাকার সময় একজনকে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে ঘুরছে তার আইটি ফার্মের জন্য পাখা বানাবে। দেখলেন তো, শুধু চারুকলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়; জানা-অজানায় নাগরিক আর ফোর জি জীবনে টুক করে ঢুকে পড়েছে নববর্ষ।আমাদের নববর্ষ। এই তো চাই!

এবার একটু পেছনে ফিরি। বর্তমান দশক তো না হয় ফেসবুক, ইন্টারনেটের আর ব্র্যান্ডিং এর। তার আগে নববর্ষকে সবার কাছে চাঙ্গা করে রাখতটা কে? এককথায় বৈশাখী মেলা। কৈশোরে মূল আকর্ষণটাই ছিল মেলায় গিয়ে নানারকম “অ্যানালগ” মাটির কিংবা কাঠের তৈরি খেলনা কেনা। তখন ধানমন্ডি মাঠেও যে জাঁকজমকপূর্ণ মেলা হতো, তাতে গ্রামীণ আবহ খুঁজে পাওয়া যেত খুব। এখন মেলাটা নগরে কম, গ্রামে বেশি। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রা আছে আগের মতই, কিংবা তার চেয়েও জাঁকজমক।

অজান্তেই নববর্ষের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা পান্তা-ইলিশের ভূত কিছুটা হলেও নেমেছে। তবে, নেমেছেই বা বলি কি করে? চড়া দামের ইলিশগুলো তো আর শ্যাওড়া গাছের পেত্নি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে না। আমরা আবার সব বিষয়েই বেশ এক্সট্রিম। পান্তা-ইলিশ যখন ছেড়েই দিতে হলো, নববর্ষের দিন অনেকেই বাংলা খাবার ছেড়ে চীন, থাই আর ইউরোপিয়ান রান্নাঘরের স্বাদ নিচ্ছেন। বলবেন তো, প্রশ্নই ওঠে না! তাহলে এবারই একটু নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার শেষে রেস্টুরেন্টে ঢু মেরে পরখ করে আসতে পারেন।

এবার আরেকটু পেছনে যাই। তখন বাবার চাকরিসূত্রে যশোরে।ক্লাস টু তে পড়ি। সেখানের বিডি হলের পেছনে দেখতাম নববর্ষের আগে নানান রকম মুখোশ বানাচ্ছে। আর নববর্ষের দিন বের হতাম মঙ্গল শোভাযাত্রায়। অজানা একটি বিষয় হলো, ইতিহাসের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার দাবিও করে তারা। ১৯৮৫ সালে।পরের অধ্যায় তো সবার জানা। ১৯৮৯ থেকে শুরু হয় চারুকলায়। সে আলাপে যাব না। মূল বিষয় হলো, ঢাকার বাইরে মঙ্গল শোভাযাত্রার এ ঐতিহ্য নববর্ষের ব্যপ্তিটাকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এবার চলে যাবো ইতিহাসে। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের দমন পীড়নের জবাব ছিল রমনা বটমূলের আয়োজন। “এসো হে বৈশাখ” সে চেতনাতেও ফিরিয়ে নিয়ে যায় অনায়াসে।

এতো গেলো উৎসব আর উদযাপনের অধ্যায়। নববর্ষ যে শুধু মানুষ নয়, মাটির সাথেও মিশে আছে, তা জানতে হলে ফিরতে হবে অনেক বছর পেছনে। সেখানে জমিদারদের ভূমির কর পরিশোধ শেষে মিষ্টিমুখের রীতি কিংবা চাষাবাদে বাংলা সনের গুরুত্ব সেই মাটির কাছেই নিয়ে দাঁড় করাবে আজকের নববর্ষকে।

একেবারে শেষে এসে ইতিহাসের শুরুর মানুষটার নাম বলি। সম্রাট আকবর। ব্যাস, বাকিটা তো আপনাদের জানা। শুধু এটুকু জানিয়ে দেই, বাংলা সনের প্রচলন সম্রাট আকবর করলেও সেটাকে জনপ্রিয় করে যেতে পারেননি তিনি। অপেক্ষা করতে হয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেব পর্যন্ত।

তা হোক। আজকের দিনে সম্রাট আকবর যদি এতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখতেন, ঘুঁচতো না কি তার আক্ষেপ? আমার মতে একটু হলেও রয়ে যেত। কারণ, আমরা নববর্ষ উদযাপনকে আমাদের করতে পেরেছি, বাংলা সন কিংবা ক্যালেন্ডারকে নয়। এখনো বাংলা নববর্ষের অবস্থান ক্যালেন্ডারে দেখতে হাতড়ে ফিরি ১৪ এপ্রিল। ১৫ এপ্রিল থেকে আবার মনে অজানা প্রশ্ন: “আজ  জানি বাংলা মাসের কত তারিখ?”

সে প্রশ্ন থাকুক।চলুন, মনটাকে নববর্ষের তুলি দিয়ে এঁকে মনখুলে বলি:

‘এ নববর্ষ আমার।

কে এই আমি?

কোটি প্রাণের আমি।

আমার নাম বাংলাদেশ’।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, বাংলাদেশ সরকার

Tag :

ভিডিও

এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

Azam Rehman

তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- মির্জা ফখরুল

নববর্ষ কার?

আপডেট টাইম ১০:২৫:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ১৩ এপ্রিল ২০১৯

মনদ্বীপ ঘরাই

প্রশ্নটা শিশুতোষ মনে করতেই পারেন। আমার কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই ইদানিং নববর্ষ উদযাপনকে নানান ট্যাগে ভূষিত করছেন। ধর্মীয় বা রাজনীতিক আলোচনায় যাব না সঙ্গত কারণেই। শুধু সমাজ আর ইতিহাসে চোখ রাখলেও প্রশ্নটার ব্যবচ্ছেদ করে একটা উত্তর ঠিকই বের করে আনা যাবে।

ইতিহাসের কাটখোট্টা আলোচনা করে উৎসবের এই সময়টাতে ঘুম পাড়াতে চাই না। বরং জীবন আর চারপাশের সাথে ইতিহাস মিশিয়ে এগুলে একটু সুখকর হবে।

সবাই তো ইতিহাস থেকে বর্তমানে যায়। আমরা বরং উল্টোটা করি। বর্তমান থেকে ইতিহাসের পাতায় ঢুকি।

বর্তমান সময়টাতে ব্র্যান্ডিং জেঁকে বসেছে নববর্ষের ঘাড়ে। বিভিন্ন ব্র্যান্ড তাদের অফার নিয়ে হাজির। এটাকে আপনারা কি বলবেন জানি না, তবে আমি শুভ চোখেই দেখছি। নতুন কাপড়, বাঙলি খাবার থেকে শুরু করে নববর্ষের ছবি ও গান; সব নিয়ে চলছে ব্র্যান্ডিং। ছবি ও গানের বিষয়টা খুলেই বলি। একটা বহুল পরিচিত কোম্পানি উদ্যোগ নিয়েছে ইন্টারনেট দুনিয়ায় বিশ্বের অন্যান্য উৎসবের মতো নববর্ষকেও বহুল পরিচিত করতে। নিঃসন্দেহে শুভ উদ্যোগ। সেই সাথে তাদের প্রোডাক্ট প্রমোশনটাও হয়ে গেল। আর নববর্ষের আত্মার আত্মীয় “এসো হে বৈশাখ” গানটাকেও এবারের নববর্ষে দারুন ব্র্যান্ডিং করেছে বহুজাতিক একটি কোমল পানীয় কোম্পানি। বাদ্যযন্ত্রের জায়গা নিয়েছে তাদের পানীয়ের বোতল। সুপার শপগুলোতে গেলেই চোখে পড়বে নানান মিষ্টি আর পিঠা দিয়ে সাজানো কুলো। সেদিন আমার ছোট্ট পত্রিকা কাদামাটির প্রকাশনার কাজে প্রেসে থাকার সময় একজনকে দেখলাম হন্তদন্ত হয়ে ঘুরছে তার আইটি ফার্মের জন্য পাখা বানাবে। দেখলেন তো, শুধু চারুকলা আর মঙ্গল শোভাযাত্রা নয়; জানা-অজানায় নাগরিক আর ফোর জি জীবনে টুক করে ঢুকে পড়েছে নববর্ষ।আমাদের নববর্ষ। এই তো চাই!

এবার একটু পেছনে ফিরি। বর্তমান দশক তো না হয় ফেসবুক, ইন্টারনেটের আর ব্র্যান্ডিং এর। তার আগে নববর্ষকে সবার কাছে চাঙ্গা করে রাখতটা কে? এককথায় বৈশাখী মেলা। কৈশোরে মূল আকর্ষণটাই ছিল মেলায় গিয়ে নানারকম “অ্যানালগ” মাটির কিংবা কাঠের তৈরি খেলনা কেনা। তখন ধানমন্ডি মাঠেও যে জাঁকজমকপূর্ণ মেলা হতো, তাতে গ্রামীণ আবহ খুঁজে পাওয়া যেত খুব। এখন মেলাটা নগরে কম, গ্রামে বেশি। তবে মঙ্গল শোভাযাত্রা আছে আগের মতই, কিংবা তার চেয়েও জাঁকজমক।

অজান্তেই নববর্ষের অনুষঙ্গ হয়ে ওঠা পান্তা-ইলিশের ভূত কিছুটা হলেও নেমেছে। তবে, নেমেছেই বা বলি কি করে? চড়া দামের ইলিশগুলো তো আর শ্যাওড়া গাছের পেত্নি এসে ছোঁ মেরে নিয়ে যাচ্ছে না। আমরা আবার সব বিষয়েই বেশ এক্সট্রিম। পান্তা-ইলিশ যখন ছেড়েই দিতে হলো, নববর্ষের দিন অনেকেই বাংলা খাবার ছেড়ে চীন, থাই আর ইউরোপিয়ান রান্নাঘরের স্বাদ নিচ্ছেন। বলবেন তো, প্রশ্নই ওঠে না! তাহলে এবারই একটু নববর্ষের মঙ্গল শোভাযাত্রার শেষে রেস্টুরেন্টে ঢু মেরে পরখ করে আসতে পারেন।

এবার আরেকটু পেছনে যাই। তখন বাবার চাকরিসূত্রে যশোরে।ক্লাস টু তে পড়ি। সেখানের বিডি হলের পেছনে দেখতাম নববর্ষের আগে নানান রকম মুখোশ বানাচ্ছে। আর নববর্ষের দিন বের হতাম মঙ্গল শোভাযাত্রায়। অজানা একটি বিষয় হলো, ইতিহাসের প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার দাবিও করে তারা। ১৯৮৫ সালে।পরের অধ্যায় তো সবার জানা। ১৯৮৯ থেকে শুরু হয় চারুকলায়। সে আলাপে যাব না। মূল বিষয় হলো, ঢাকার বাইরে মঙ্গল শোভাযাত্রার এ ঐতিহ্য নববর্ষের ব্যপ্তিটাকেই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এবার চলে যাবো ইতিহাসে। ষাটের দশকে পাকিস্তান সরকারের দমন পীড়নের জবাব ছিল রমনা বটমূলের আয়োজন। “এসো হে বৈশাখ” সে চেতনাতেও ফিরিয়ে নিয়ে যায় অনায়াসে।

এতো গেলো উৎসব আর উদযাপনের অধ্যায়। নববর্ষ যে শুধু মানুষ নয়, মাটির সাথেও মিশে আছে, তা জানতে হলে ফিরতে হবে অনেক বছর পেছনে। সেখানে জমিদারদের ভূমির কর পরিশোধ শেষে মিষ্টিমুখের রীতি কিংবা চাষাবাদে বাংলা সনের গুরুত্ব সেই মাটির কাছেই নিয়ে দাঁড় করাবে আজকের নববর্ষকে।

একেবারে শেষে এসে ইতিহাসের শুরুর মানুষটার নাম বলি। সম্রাট আকবর। ব্যাস, বাকিটা তো আপনাদের জানা। শুধু এটুকু জানিয়ে দেই, বাংলা সনের প্রচলন সম্রাট আকবর করলেও সেটাকে জনপ্রিয় করে যেতে পারেননি তিনি। অপেক্ষা করতে হয়েছিল সম্রাট আওরঙ্গজেব পর্যন্ত।

তা হোক। আজকের দিনে সম্রাট আকবর যদি এতো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন দেখতেন, ঘুঁচতো না কি তার আক্ষেপ? আমার মতে একটু হলেও রয়ে যেত। কারণ, আমরা নববর্ষ উদযাপনকে আমাদের করতে পেরেছি, বাংলা সন কিংবা ক্যালেন্ডারকে নয়। এখনো বাংলা নববর্ষের অবস্থান ক্যালেন্ডারে দেখতে হাতড়ে ফিরি ১৪ এপ্রিল। ১৫ এপ্রিল থেকে আবার মনে অজানা প্রশ্ন: “আজ  জানি বাংলা মাসের কত তারিখ?”

সে প্রশ্ন থাকুক।চলুন, মনটাকে নববর্ষের তুলি দিয়ে এঁকে মনখুলে বলি:

‘এ নববর্ষ আমার।

কে এই আমি?

কোটি প্রাণের আমি।

আমার নাম বাংলাদেশ’।

লেখক: সিনিয়র সহকারী সচিব, বাংলাদেশ সরকার