ঢাকা ১২:০৫ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

ফুলপরির মুখে ভয়ঙ্কর সেই ৫ ঘণ্টা, মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি

মরিয়ম চম্পা:: লাথি, ঘুষি। জামা খুলতে বাধ্য করা। ভিডিও ধারণ। হুমকি। ভয়ঙ্কর পাঁচ ঘণ্টা। বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন নির্যাতনের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফুলপরি। অমানবিক, লোমহর্ষক বিবরণ। ১২ই ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১১টা। ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা তার দুই অনুসারী দিয়ে গণরুমে ডেকে নেন ফুলপরিকে। সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি শুরু হয়।

যে যেভাবে পেরেছে মেরেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আলপিন দিয়ে আঘাতও করা হয়।
ফুলপরি বলেন, আমি তাদের হাত-পা ধরে কাঁদতে থাকি। একজন চোখের সামনে আলপিন ধরে। হুমকি দেয় চোখ গলে দিবে। অন্যরা তাকে নিবৃত্ত করে। এত মার দিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমি মরে যাচ্ছি। অন্তরা মারছিল আর বলছিল, তুই বলেছিলি তোর বাবা নাকি সরকারি চাকরিজীবী? তখন আমি বলি, এটা বলিনি আমি। তখন আরও বেশি মারে। এবং বলে বলিসনি? তখন এত মারছিল যে, সহ্য করতে না পেরে বলি, জ্বি বলেছি। মাথায় খুব মারছিল। গলায় গামছা দিয়ে ফাঁস দিচ্ছিল। চেপে ধরেছিল। আমি হাত দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করি। নিচে পড়ে গিয়ে কান্না করছিলাম। তখন মুখের ভেতর গামছা ভরে দেয়। রাত ২টা পর্যন্ত এভাবে গণরুমে টানা মারার পর ডাইনিং রুমে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়েও মারতে শুরু করে। ছাত্রলীগ নেত্রী তাবাসসুম নিজেকে উদ্দেশ্য করে খুব খারাপ গালি লিখেন। পরে সেটা আমাকে পড়তে বলেন। আমি বলি, না এগুলো পড়বো না। এরপর ভীষণ মারতে থাকে। 

একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে পড়ি। তারা সেটা রেকর্ড করে। তখন তাবাসসুম বলছিল, আমি খারাপ মেয়ে (গালি), এটা বলার তোর সাহস হয় কীভাবে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাবাসসুম, নদী এরা মারছিল। এক পর্যায়ে বলি পানি খাবো। এ সময় ডাইনিংয়ের মেঝেতে পড়ে থাকা একটি নোংরা গ্লাসে পানি খেতে দেয়। চুপ করে থাকলে মারে। কান্না করলেও মারে। তখন ছাত্রলীগের নেত্রী, প্রভোস্ট স্যারদের উদ্দেশ্যে বাজে কথা বলতে বলে। পরে সেটা ভিডিও করে। শরীরে থাকা জামা খুলতে আমাকে বাধ্য করে। সবকিছু খুলে ফেলার চেষ্টা করে। পরে জামা তুলে সেটা ফোনে ভিডিও করেন। শরীরের আঘাত করা স্থানগুলো যখন খুব ফুলে যাচ্ছিল তখন মাথায়-গায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছিল। আমাকে নিয়ে মজা করছিল। বলছিল খালি গায়ে শরীর দুলিয়ে নাচ। বলি, আমি নাচতে পারি না। তখন লাথি মেরে আমাকে ফেলে দেয়। বলে, ক্যাম্পাসের ছেলে-ভাইদের দিয়ে তোর সঙ্গে খারাপ কাজ করাবো। এখানে তোকে ফাঁসি দিয়ে রেখে দিলে কে কী করবে? আমার থেকে একটি লিখিত নেয় এই মর্মে, আমার যদি কিছু হয় তাহলে হলের কোনো আপু দায়ী থাকবে না। মারধরের শেষ পর্যায়ে আমাকে দশ মিনিট সময় দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন, তুই  কাউকে এ বিষয়ে কিছু বলবি না। ক্যাম্পাসে সবসময় আমাদের কথামতো চলবি। আমাদের কাছে যে ভিডিও আছে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দিবো। এটা ভাইরাল হলে তুই ফাঁস দিয়ে মরবি। তোর বাবা-মা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। কিছু করতে পারবে না। তোর এখানে কেউ নেই। রাত পৌনে চারটা পর্যন্ত এ নির্যাতন চলে।  

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ফুলপরি বর্তমানে গ্রামের বাড়ি পাবনায় বাবা-মায়ের কাছে অবস্থান করছেন। ফুলপরি বলেন, আমার এক স্যার ছিল। আজাদ স্যার। স্যারের কাছে গিয়েছিলাম হলে যেন আমার একটি সিটের ব্যবস্থা করে দেন। হলের বাইরে মেসভাড়া-খাওয়ার খরচ জোটানোর সামর্থ্য নেই আমার। স্যার পরবর্তীতে আমার ডিপার্টমেন্টের স্যারের কাছে সিটের কথা বলে পাঠান। এখান থেকে মূলত তাদের ক্ষোভের শুরু। হল থেকে ছাত্রলীগ নেত্রী অন্তরা আমাকে বের করে দিতে চেয়েছে, সেখানে স্যারেরা এ সময় একটি সমাধানের ব্যবস্থা করলে তিনি ক্ষেপে যান। সকল ক্ষোভ একত্রিত করে আমার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। একদম শেষ পর্যায়ে আমাকে অন্য একটি রুমে নিয়ে বলেন, এখানে শুয়ে থাকবি। আত্মহত্যা করবি না কিন্তু। ওখানে দেখি আমার ফোনটা পড়ে আছে।

 আপুকে রাত ৪টা ১৪ মিনিটে একটি এসএমএস করি, আমার অবস্থা ভালো না, কীভাবে হল থেকে বের হবো। আমাকে হল থেকে বের করে নিয়ে যাও’। পরে নিচতলার পূর্বদিকে থাকা একটি বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনতলায় আমার রুমে যাই। ব্যাগে প্রায় ৫শ’ টাকার মতো ছিল, সেটা নিয়ে বোরকা পরে এক আপুকে বলি আমার ক্লাসে যেতে হবে। তখন আমাকে তিনি যেতে দেন। এরপর হল থেকে বেরিয়ে আমি বাসস্ট্যান্ডে এসে পাবনার একটি বাসের টিকিট কেটে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসে কাউকে কিছু বলিনি। বাবা-মা সবাই ভেবেছে বরাবরের মতোই স্বাভাবিক আছি। পরে ভাইয়াকে বললে তিনি আমাকে রাগ করে বলেন, আগে বলিসনি কেন? এরপরই মূলত পুরো বিষয়টি সবাই জেনে যায়। ওখানে ছাত্রলীগ নেত্রী অন্তরাসহ মোট ৫ জন ছিলেন। যাদের মধ্যে ৪ জন আমাকে মারধর করে। আরেকজন ভয় দেখিয়েছেন। সরাসরি মারেননি। 

এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফুলপরির বাবা মো. আতাউর রহমান। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে সেটা শোনার পর বাবা-মা হিসেবে আমাদের কতোটা খারাপ লেগেছে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যারা এই অন্যায় এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনের মাধ্যমে ন্যায় এবং সুষ্ঠু বিচার আশা করছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। আমরা চাই প্রচলিত আইনে আদালতের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার। মামলা করার বিষয়ে আমাদের চিন্তা আছে। অবশ্যই মামলা করবো। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নিজে এতিম ছিলাম। নানীর কাছে মানুষ হয়েছি। পড়ালেখা করতে পারিনি। তাই অনেক কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করছি। কোনো ঈদে ওদেরকে নতুন জামা দিতে পারিনি। শুধু সন্তানদের সঠিক শিক্ষায় মানুষ করতে চেয়েছি। যেন ওরা দেশ এবং সমাজের মানুষের কল্যাণ করতে পারে। 

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের মেয়ে ফুলপরি। সাড়ে ২৩ শতাংশ জমির ওপর একটি ঘর আর পুকুর এটাই তাদের সম্বল। পাটখড়ি আর টিনের বেড়ার তিন কক্ষবিশিষ্ট ঘরটিতেই কোনোভাবে বসবাস করছেন ফুলপরি এবং তার পরিবার। চার ভাইবোনের মধ্যে ফুলপরি তৃতীয়। বাবা ভ্যানচালক। ভাই-বোন সবাই বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করছে। বড় ভাই মো. হযরত আলী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পাস করে এখন বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বড় বোন হোসনেআরা খাতুন পাবনা মহিলা কলেজ থেকে পাস করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ছোট ভাই মো. ওমর আলী দশম শ্রেণির ছাত্র। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে পাস করে কোনো ভর্তি কোচিং ছাড়াই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনান্সে সুযোগ পেলেও অনেক আশা করে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে ২০২১-২২ ভর্তি হন ফুলপরি। মা তাসলিমা খাতুন গৃহিণী।

Tag :

ভিডিও

এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

Azam Rehman

ফুলপরির মুখে ভয়ঙ্কর সেই ৫ ঘণ্টা, মনে হচ্ছিল আমি মরে যাচ্ছি

আপডেট টাইম ০২:৪১:২২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩
মরিয়ম চম্পা:: লাথি, ঘুষি। জামা খুলতে বাধ্য করা। ভিডিও ধারণ। হুমকি। ভয়ঙ্কর পাঁচ ঘণ্টা। বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন নির্যাতনের শিকার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফুলপরি। অমানবিক, লোমহর্ষক বিবরণ। ১২ই ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাত ১১টা। ছাত্রলীগ নেত্রী সানজিদা চৌধুরী অন্তরা তার দুই অনুসারী দিয়ে গণরুমে ডেকে নেন ফুলপরিকে। সেখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে এলোপাতাড়ি চড়-থাপ্পড়, কিল-ঘুষি শুরু হয়।

যে যেভাবে পেরেছে মেরেছে। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আলপিন দিয়ে আঘাতও করা হয়।
ফুলপরি বলেন, আমি তাদের হাত-পা ধরে কাঁদতে থাকি। একজন চোখের সামনে আলপিন ধরে। হুমকি দেয় চোখ গলে দিবে। অন্যরা তাকে নিবৃত্ত করে। এত মার দিচ্ছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি আমি মরে যাচ্ছি। অন্তরা মারছিল আর বলছিল, তুই বলেছিলি তোর বাবা নাকি সরকারি চাকরিজীবী? তখন আমি বলি, এটা বলিনি আমি। তখন আরও বেশি মারে। এবং বলে বলিসনি? তখন এত মারছিল যে, সহ্য করতে না পেরে বলি, জ্বি বলেছি। মাথায় খুব মারছিল। গলায় গামছা দিয়ে ফাঁস দিচ্ছিল। চেপে ধরেছিল। আমি হাত দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করি। নিচে পড়ে গিয়ে কান্না করছিলাম। তখন মুখের ভেতর গামছা ভরে দেয়। রাত ২টা পর্যন্ত এভাবে গণরুমে টানা মারার পর ডাইনিং রুমে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়েও মারতে শুরু করে। ছাত্রলীগ নেত্রী তাবাসসুম নিজেকে উদ্দেশ্য করে খুব খারাপ গালি লিখেন। পরে সেটা আমাকে পড়তে বলেন। আমি বলি, না এগুলো পড়বো না। এরপর ভীষণ মারতে থাকে। 

একপর্যায়ে বাধ্য হয়ে পড়ি। তারা সেটা রেকর্ড করে। তখন তাবাসসুম বলছিল, আমি খারাপ মেয়ে (গালি), এটা বলার তোর সাহস হয় কীভাবে। গায়ের সমস্ত শক্তি দিয়ে তাবাসসুম, নদী এরা মারছিল। এক পর্যায়ে বলি পানি খাবো। এ সময় ডাইনিংয়ের মেঝেতে পড়ে থাকা একটি নোংরা গ্লাসে পানি খেতে দেয়। চুপ করে থাকলে মারে। কান্না করলেও মারে। তখন ছাত্রলীগের নেত্রী, প্রভোস্ট স্যারদের উদ্দেশ্যে বাজে কথা বলতে বলে। পরে সেটা ভিডিও করে। শরীরে থাকা জামা খুলতে আমাকে বাধ্য করে। সবকিছু খুলে ফেলার চেষ্টা করে। পরে জামা তুলে সেটা ফোনে ভিডিও করেন। শরীরের আঘাত করা স্থানগুলো যখন খুব ফুলে যাচ্ছিল তখন মাথায়-গায়ে পানি ঢেলে দিচ্ছিল। আমাকে নিয়ে মজা করছিল। বলছিল খালি গায়ে শরীর দুলিয়ে নাচ। বলি, আমি নাচতে পারি না। তখন লাথি মেরে আমাকে ফেলে দেয়। বলে, ক্যাম্পাসের ছেলে-ভাইদের দিয়ে তোর সঙ্গে খারাপ কাজ করাবো। এখানে তোকে ফাঁসি দিয়ে রেখে দিলে কে কী করবে? আমার থেকে একটি লিখিত নেয় এই মর্মে, আমার যদি কিছু হয় তাহলে হলের কোনো আপু দায়ী থাকবে না। মারধরের শেষ পর্যায়ে আমাকে দশ মিনিট সময় দিয়ে বোঝাচ্ছিলেন, তুই  কাউকে এ বিষয়ে কিছু বলবি না। ক্যাম্পাসে সবসময় আমাদের কথামতো চলবি। আমাদের কাছে যে ভিডিও আছে সেটা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল করে দিবো। এটা ভাইরাল হলে তুই ফাঁস দিয়ে মরবি। তোর বাবা-মা সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। কিছু করতে পারবে না। তোর এখানে কেউ নেই। রাত পৌনে চারটা পর্যন্ত এ নির্যাতন চলে।  

ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের ছাত্রী ফুলপরি বর্তমানে গ্রামের বাড়ি পাবনায় বাবা-মায়ের কাছে অবস্থান করছেন। ফুলপরি বলেন, আমার এক স্যার ছিল। আজাদ স্যার। স্যারের কাছে গিয়েছিলাম হলে যেন আমার একটি সিটের ব্যবস্থা করে দেন। হলের বাইরে মেসভাড়া-খাওয়ার খরচ জোটানোর সামর্থ্য নেই আমার। স্যার পরবর্তীতে আমার ডিপার্টমেন্টের স্যারের কাছে সিটের কথা বলে পাঠান। এখান থেকে মূলত তাদের ক্ষোভের শুরু। হল থেকে ছাত্রলীগ নেত্রী অন্তরা আমাকে বের করে দিতে চেয়েছে, সেখানে স্যারেরা এ সময় একটি সমাধানের ব্যবস্থা করলে তিনি ক্ষেপে যান। সকল ক্ষোভ একত্রিত করে আমার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়। একদম শেষ পর্যায়ে আমাকে অন্য একটি রুমে নিয়ে বলেন, এখানে শুয়ে থাকবি। আত্মহত্যা করবি না কিন্তু। ওখানে দেখি আমার ফোনটা পড়ে আছে।

 আপুকে রাত ৪টা ১৪ মিনিটে একটি এসএমএস করি, আমার অবস্থা ভালো না, কীভাবে হল থেকে বের হবো। আমাকে হল থেকে বের করে নিয়ে যাও’। পরে নিচতলার পূর্বদিকে থাকা একটি বাথরুম থেকে বেরিয়ে তিনতলায় আমার রুমে যাই। ব্যাগে প্রায় ৫শ’ টাকার মতো ছিল, সেটা নিয়ে বোরকা পরে এক আপুকে বলি আমার ক্লাসে যেতে হবে। তখন আমাকে তিনি যেতে দেন। এরপর হল থেকে বেরিয়ে আমি বাসস্ট্যান্ডে এসে পাবনার একটি বাসের টিকিট কেটে বাসায় চলে আসি। বাসায় এসে কাউকে কিছু বলিনি। বাবা-মা সবাই ভেবেছে বরাবরের মতোই স্বাভাবিক আছি। পরে ভাইয়াকে বললে তিনি আমাকে রাগ করে বলেন, আগে বলিসনি কেন? এরপরই মূলত পুরো বিষয়টি সবাই জেনে যায়। ওখানে ছাত্রলীগ নেত্রী অন্তরাসহ মোট ৫ জন ছিলেন। যাদের মধ্যে ৪ জন আমাকে মারধর করে। আরেকজন ভয় দেখিয়েছেন। সরাসরি মারেননি। 

এ ঘটনায় মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছেন ফুলপরির বাবা মো. আতাউর রহমান। তিনি বলেন, আমার মেয়েকে যেভাবে নির্যাতন করা হয়েছে সেটা শোনার পর বাবা-মা হিসেবে আমাদের কতোটা খারাপ লেগেছে সেটা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। যারা এই অন্যায় এবং নির্যাতনের ঘটনা ঘটিয়েছে তাদের বিরুদ্ধে আমরা আইনের মাধ্যমে ন্যায় এবং সুষ্ঠু বিচার আশা করছি। আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বরাবর লিখিত অভিযোগ জানিয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করতে পারবে না। আমরা চাই প্রচলিত আইনে আদালতের মাধ্যমে এর সুষ্ঠু বিচার। মামলা করার বিষয়ে আমাদের চিন্তা আছে। অবশ্যই মামলা করবো। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নিজে এতিম ছিলাম। নানীর কাছে মানুষ হয়েছি। পড়ালেখা করতে পারিনি। তাই অনেক কষ্ট করে খেয়ে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের মানুষ করছি। কোনো ঈদে ওদেরকে নতুন জামা দিতে পারিনি। শুধু সন্তানদের সঠিক শিক্ষায় মানুষ করতে চেয়েছি। যেন ওরা দেশ এবং সমাজের মানুষের কল্যাণ করতে পারে। 

পাবনার আটঘরিয়া উপজেলার ধর্মপুর গ্রামের মেয়ে ফুলপরি। সাড়ে ২৩ শতাংশ জমির ওপর একটি ঘর আর পুকুর এটাই তাদের সম্বল। পাটখড়ি আর টিনের বেড়ার তিন কক্ষবিশিষ্ট ঘরটিতেই কোনোভাবে বসবাস করছেন ফুলপরি এবং তার পরিবার। চার ভাইবোনের মধ্যে ফুলপরি তৃতীয়। বাবা ভ্যানচালক। ভাই-বোন সবাই বৃত্তি পেয়ে পড়াশোনা করছে। বড় ভাই মো. হযরত আলী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে পাস করে এখন বিসিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বড় বোন হোসনেআরা খাতুন পাবনা মহিলা কলেজ থেকে পাস করে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছেন। ছোট ভাই মো. ওমর আলী দশম শ্রেণির ছাত্র। পাবনা সরকারি এডওয়ার্ড কলেজ থেকে পাস করে কোনো ভর্তি কোচিং ছাড়াই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইনান্সে সুযোগ পেলেও অনেক আশা করে কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগে ২০২১-২২ ভর্তি হন ফুলপরি। মা তাসলিমা খাতুন গৃহিণী।