সংবাদ শিরোনাম
তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- মির্জা ফখরুল ঠাকুরগাঁওয়ে দাম্পত্য কলহের জেরে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধুর মৃত্যু, স্বামী পলাতক সাংবাদিকতার চাইতে চ্যালেঞ্জিং পেশা আর নেই-মির্জা ফখরুল পীরগঞ্জ প্রাণিসম্পদ দপ্তরে নির্ধারিত ৫শ৪৬ খামারীর মাঝে পশুখাদ্য ও উপকরণ বিতরণ পীরগঞ্জ উপজেলা পরিষদে এমপি’র অফিস উদ্বোধন পীরগঞ্জে সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাথে স্থানীয় এমপি;র মত-বিনীময় সভা অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁওয়ে আল-হাসানাহ স্কুলের ১ম ত্রৈ-মাসিক পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ ও অভিভাবক সমাবেশ অনুষ্ঠিত পীরগঞ্জে সাড়ে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩ কিলোমিটার খাল-খনন প্রকল্পের উদ্বোধন পীরগঞ্জে পূর্ব চৌরাস্তা ব্যাবসায়ী সমিতি নির্বাচন-রব্বানী সভাপতি, রাজা সম্পাদক পীরগঞ্জে সিসি ক্যামেরার আওতায় নকলমুক্ত পরিবেশে এসএসসি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত

আব্দুর রহমানকে কেন জেনারেল এরশাদ প্যারিস অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়েছিলেন?

  • Yeasmin Ananna
  • আপডেট টাইম ০৫:৫৩:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৩
  • ২২৭ বার
ডেস্ক:: জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার কার্যের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল তার চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমান ছিলেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফ্উদ্দৌলাহ্’র বাল্য বন্ধু। নাটকীয় জীবন ছিল মেজর জেনারেল আব্দুর রহমানের। জিয়াউর রহমান হত্যায় অভিযুক্ত আসামীদের স্বীকারোক্তিতে এরশাদের সম্পৃক্ততার কথা থাকায় আব্দুর রহমানকে বিপদজ্জনক মনে করেন জেনারেল এরশাদ। তাকে সরিয়ে প্যারিস অ্যাম্বাসিতে নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানেই রহস্যজনক মৃত্যুবরণ করেন আব্দুর রহমান। তার লাশ পোস্টমর্টেম পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। মানবজমিন ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলাহর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘স্মৃতিরা পোহায় রোদ্দুর’-এর একাংশে সেই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
আসাফউদ্দৌলাহ লিখেছেন, স্কুলের আরেক বন্ধু ছিল আব্দুর রহমান। তার ডাকনাম ছিল বাচ্চু। পরবর্তী জীবনে সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঢাকাস্থ নবম ডিভিশনের জিওসি’র দায়িত্ব পালন করে।

ও বিয়ে করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর আবদুল মতিন চৌধুরী সাহেবের কন্যা লাকিকে। অনেক প্রেম করে, অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ওদের বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়। মতিন সাহেবের সম্মতি ছিল না এই বিয়েতে। এর পরবর্তী কাহিনী অত্যন্ত বেদনার। পাকিস্তান থেকে যখন ফিরে এলো ১৯৭৩ সালে তখন ওদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এরপরে আবদুর রহমান বিয়ে করে বেহেরুজকে। অনেক চেষ্টা করেও বাচ্চু সুখী হতে পারেনি দ্বিতীয় বিয়ে করেও। যেহেতু তার আত্মাজুড়ে ছিল লাকি।
আমি নিজে দেখেছি কী প্রচণ্ড চেষ্টা করতো আব্দুর রহমান যাতে সে বেহেরুজকে ভালোবাসতে পারে। কিন্তু লাকির স্মৃতি তার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে লাকির সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেছিল। পুড়িয়ে ফেলেছিল তার সব চিঠি। কিন্তু আব্দুর রহমান জানতো না যে স্মৃতিকে পোড়ানো যায় না। পোড়াবার চেষ্টা করলে সে যেন দ্বিগুণ বেগে আক্রমণ করে সত্তাকে। আমি একটি মিটিংয়ে গিয়েছিলাম প্যারিসে। সেখানে মুঈদ সাহেবের বাসায় একটি পার্টি ছিল এবং যেখানে লাকিও ছিল আমন্ত্রিত। লাকিকে এক পাশে নিয়ে রাত এগারোটা থেকে আমি বাচ্চুর পক্ষে ওকালতি করতে শুরু করলাম। কখন পার্টি শেষ হয়েছে আমরা কেউ জানি না। কখন চলে গেছে সব অতিথি তারও খেয়াল রাখিনি। কথা যখন শেষ হলো রাত্রিও শেষ হলো। কিন্তু লাকির মুখে বার বার একই কথা। “But I dont love your friend anymore” কী করে সম্ভব হয় এত বছর এত ভালোবাসার পরে ভালোবাসার মানুষকে মন থেকে নির্বাসিত করা। প্রেমের উচ্ছ্বসিত পাত্র কখনো যে একেবারে নিঃশেষিত হতে পারে তা জীবনে প্রথমবারে বুঝলাম লাকির সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ শেষে। যেন সে আব্দুর রহমান নামে কাউকেই কোনোদিন চিনতো না। আর ওদিকে অতীতের প্রেম ধ্বংস করে দিলো আব্দুর রহমানের বর্তমান। এবং সে আবার লাকিকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। ঠিক এই সময় আব্দুর রহমানকে বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তি বললে অত্যুক্তি হবে না। এরশাদের মার্শাল ল’র প্রধান পুরুষই ছিল মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার কার্যের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় তার চেয়ারম্যান ছিল আব্দুর রহমান। সে আমাকে বলেছিল যে, যে ১৮ জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয় তারা সবাই আদালতে বলেছিল জিয়াউর রহমানের হত্যায় সরাসরি এরশাদের সংশ্লেষ। তারা নাকি বলেছিল আমাদের তো শাস্তি হবার কথা নয়, কথা তো পুরস্কৃত হওয়ার। কেননা, জেনারেল মঞ্জুরকে এরশাদই হত্যা করে তার পথের কাঁটা সরাবার জন্য। এই স্বীকারোক্তিগুলো যাতে তার বিরুদ্ধে কেউ কখনো ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য এই স্বীকারোক্তিগুলোর মূল কপি এরশাদ আব্দুর রহমানের কাছে চায় কিন্তু আবদুর রহমান সেগুলো এরশাদকে দেবে না বলেই তার নিজের বাসায় এনে রেখেছিল। আব্দুর রহমান তার জন্য বিপজ্জনক ভেবেই এরশাদ তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। আমি যেটুকু জানতে পেরেছি এরশাদ মরিয়া হয়ে উঠেছিল এই স্বীকারোক্তিগুলো পাওয়ার জন্য। আর আব্দুর রহমানও জানতো যে এই কাগজগুলো পেয়ে গেলে এরশাদের কাছে তার আর কোনো মূল্যই থাকবে না। ভাবতে অবাক লাগে যে, এই নথিপত্রগুলো আব্দুর রহমান প্যারিসে কাজে যোগদানের আগেই লাকির মাধ্যমেই প্যারিসে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং কাজে যোগদান করে লাকির কাছ থেকে সে কাগজগুলো বুঝে পেয়েছিল। তখন লাকিকে আবার বিয়ে করে জীবনকে নতুন করে সাজাবার স্বপ্নে বিভোর ছিল আব্দুর রহমান। প্যারিসে যোগদানের জন্য ঢাকা থেকে যাবার সময় আব্দুর রহমানের মালপত্র তন্ন তন্ন করে ঢাকা এয়ারপোর্টে খুঁজেছিল এরশাদের পাঠানো ডিজিএফআই। তারা পাগলের মতো খুঁজছিল সেই স্বীকারোক্তির কাগজপত্র। আব্দুর রহমান এতে দারুণ ক্ষুব্ধ হলেও তার করার কিছু ছিল না। আব্দুর রহমানের সঙ্গে মুজিব নামের এক সেনা সদস্যকে প্যারিস অ্যাম্বাসিতে পোস্ট করা হলো রহমানের বিশেষ দেহরক্ষী পদে। এটাও ছিল এরশাদের আব্দুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ।

বেহরুজের ঘরে আব্দুর রহমানের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। সে রহমানের সঙ্গে প্যারিসে বসবাস করতো। সে আমাকে বলেছে যে হঠাৎ প্যারিসে তার স্কুলে ড্রাইভার এসে উপস্থিত এবং সে বললো যে তার আব্বা মারা গেছেন। সে যেন এখনই স্কুল থেকে বাসায় চলে আসে। ছেলের নাম সানিয়ান। সে আমাকে বলে যে সে বাসায় গিয়ে দেখে দেহরক্ষী মুজিব প্যারিসে প্রচণ্ড শীতে তার আব্বার বাথরুমে কাপড় চোপড় পরে গোসল করছে। আর আব্দুর রহমানের মাথার কাছে কাঠের বাক্সটা ভাঙা পড়ে আছে যার মধ্যে ছিল ১৮ জন ফাঁসির আসামির স্বীকারোক্তি। ওর আব্বার মাথার ঘন চুল সব পড়ে ছিল বালিশের উপর। মুখটা ছিল কিঞ্চিৎ খোলা। আর উপরের পাটির সামনের দুই দাঁতের মধ্যে একটা ছোট্ট ক্ষত আর একবিন্দু রক্ত।সানিয়ান আমাকে নিজে বলেছে যে, সে স্কুল থেকে বাসায় আসার আগেই লন্ডন থেকে প্যারিস পৌঁছে যায় ব্রিগেডিয়ার এনাম। আর সে-ই মাথার কাছের কাঠের সিন্দুক ভেঙে ট্রাইব্যুনালের কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যায় এবং সেগুলো পরে পাঠিয়ে দেয় এরশাদের কাছে। এরশাদ প্রীত হয়ে তাকে ব্রিগেডিয়ার থেকে একদিনের জন্য মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর রিটায়ার্টমেন্টের সঙ্গে সঙ্গেই এনাম এবং মুজিব রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

আব্দুর রহমানের মৃতদেহ পোস্টমর্টেম করতে দেয়নি প্যারিসের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি। অথচ বিদেশে যে কোনো অপঘাতে মৃত্যু হলে পোস্টমর্টেম করানো বাধ্যতামূলক। মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছালো সকাল বেলায় একটি কফিনের মধ্যে তালা দেয়া অবস্থায়। আব্দুর রহমানের আম্মা ছেলের লাশ দেখার জন্য অনেক মিনতি করলেন সেনা কর্মকর্তাদের কাছে। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার ইমতিয়াজ কিছুতেই কফিন খোলার অনুমতি দিলেন না। আমি যখন ব্রিগেডিয়ার ইমতিয়াজকে অনুরোধ করলাম তিনি বললেন, অর্ডার নেই। এই অর্ডার কার তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হলো না। একটু পরে আর্মির ভ্যানে আব্দুর রহমানের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো এয়ারপোর্টে এবং যেখান থেকে হেলিকপ্টারে নোয়াখালীর কালিহাতী থানায় পারিবারিক গোরস্থানে আব্দুর রহমানকে সমাহিত করা হয়। আমরা কালিহাতীতে তার পাঁচজন বাল্যবন্ধু একটি মাইক্রোবাসে আব্দুর রহমানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।

Tag :

ভিডিও

এই অথরের আরো সংবাদ দেখুন

Azam Rehman

তারেক রহমানের নেতৃত্বে আজ বাংলাদেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে- মির্জা ফখরুল

আব্দুর রহমানকে কেন জেনারেল এরশাদ প্যারিস অ্যাম্বাসিতে পাঠিয়েছিলেন?

আপডেট টাইম ০৫:৫৩:৩০ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৩
ডেস্ক:: জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার কার্যের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়েছিল তার চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুর রহমান। আব্দুর রহমান ছিলেন সাবেক সচিব মোহাম্মদ আসাফ্উদ্দৌলাহ্’র বাল্য বন্ধু। নাটকীয় জীবন ছিল মেজর জেনারেল আব্দুর রহমানের। জিয়াউর রহমান হত্যায় অভিযুক্ত আসামীদের স্বীকারোক্তিতে এরশাদের সম্পৃক্ততার কথা থাকায় আব্দুর রহমানকে বিপদজ্জনক মনে করেন জেনারেল এরশাদ। তাকে সরিয়ে প্যারিস অ্যাম্বাসিতে নিয়োগ দেয়া হয়। সেখানেই রহস্যজনক মৃত্যুবরণ করেন আব্দুর রহমান। তার লাশ পোস্টমর্টেম পর্যন্ত করতে দেয়া হয়নি। মানবজমিন ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত মোহাম্মদ আসাফউদ্দৌলাহর আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘স্মৃতিরা পোহায় রোদ্দুর’-এর একাংশে সেই বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করা হয়েছে।
আসাফউদ্দৌলাহ লিখেছেন, স্কুলের আরেক বন্ধু ছিল আব্দুর রহমান। তার ডাকনাম ছিল বাচ্চু। পরবর্তী জীবনে সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ঢাকাস্থ নবম ডিভিশনের জিওসি’র দায়িত্ব পালন করে।

ও বিয়ে করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস-চ্যান্সেলর আবদুল মতিন চৌধুরী সাহেবের কন্যা লাকিকে। অনেক প্রেম করে, অনেক বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ওদের বিয়ে হয়েছিল ঢাকায়। মতিন সাহেবের সম্মতি ছিল না এই বিয়েতে। এর পরবর্তী কাহিনী অত্যন্ত বেদনার। পাকিস্তান থেকে যখন ফিরে এলো ১৯৭৩ সালে তখন ওদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়ে গেছে। এরপরে আবদুর রহমান বিয়ে করে বেহেরুজকে। অনেক চেষ্টা করেও বাচ্চু সুখী হতে পারেনি দ্বিতীয় বিয়ে করেও। যেহেতু তার আত্মাজুড়ে ছিল লাকি।
আমি নিজে দেখেছি কী প্রচণ্ড চেষ্টা করতো আব্দুর রহমান যাতে সে বেহেরুজকে ভালোবাসতে পারে। কিন্তু লাকির স্মৃতি তার সমস্ত চেতনাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল। সে লাকির সব ছবি পুড়িয়ে ফেলেছিল। পুড়িয়ে ফেলেছিল তার সব চিঠি। কিন্তু আব্দুর রহমান জানতো না যে স্মৃতিকে পোড়ানো যায় না। পোড়াবার চেষ্টা করলে সে যেন দ্বিগুণ বেগে আক্রমণ করে সত্তাকে। আমি একটি মিটিংয়ে গিয়েছিলাম প্যারিসে। সেখানে মুঈদ সাহেবের বাসায় একটি পার্টি ছিল এবং যেখানে লাকিও ছিল আমন্ত্রিত। লাকিকে এক পাশে নিয়ে রাত এগারোটা থেকে আমি বাচ্চুর পক্ষে ওকালতি করতে শুরু করলাম। কখন পার্টি শেষ হয়েছে আমরা কেউ জানি না। কখন চলে গেছে সব অতিথি তারও খেয়াল রাখিনি। কথা যখন শেষ হলো রাত্রিও শেষ হলো। কিন্তু লাকির মুখে বার বার একই কথা। “But I dont love your friend anymore” কী করে সম্ভব হয় এত বছর এত ভালোবাসার পরে ভালোবাসার মানুষকে মন থেকে নির্বাসিত করা। প্রেমের উচ্ছ্বসিত পাত্র কখনো যে একেবারে নিঃশেষিত হতে পারে তা জীবনে প্রথমবারে বুঝলাম লাকির সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ শেষে। যেন সে আব্দুর রহমান নামে কাউকেই কোনোদিন চিনতো না। আর ওদিকে অতীতের প্রেম ধ্বংস করে দিলো আব্দুর রহমানের বর্তমান। এবং সে আবার লাকিকে বিয়ে করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। ঠিক এই সময় আব্দুর রহমানকে বাংলাদেশে সবচেয়ে শক্তিমান ব্যক্তি বললে অত্যুক্তি হবে না। এরশাদের মার্শাল ল’র প্রধান পুরুষই ছিল মেজর জেনারেল আব্দুর রহমান।

জিয়াউর রহমানের হত্যাকারীদের বিচার কার্যের জন্য যে ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয় তার চেয়ারম্যান ছিল আব্দুর রহমান। সে আমাকে বলেছিল যে, যে ১৮ জনের ফাঁসির দণ্ড কার্যকর করা হয় তারা সবাই আদালতে বলেছিল জিয়াউর রহমানের হত্যায় সরাসরি এরশাদের সংশ্লেষ। তারা নাকি বলেছিল আমাদের তো শাস্তি হবার কথা নয়, কথা তো পুরস্কৃত হওয়ার। কেননা, জেনারেল মঞ্জুরকে এরশাদই হত্যা করে তার পথের কাঁটা সরাবার জন্য। এই স্বীকারোক্তিগুলো যাতে তার বিরুদ্ধে কেউ কখনো ব্যবহার করতে না পারে সেজন্য এই স্বীকারোক্তিগুলোর মূল কপি এরশাদ আব্দুর রহমানের কাছে চায় কিন্তু আবদুর রহমান সেগুলো এরশাদকে দেবে না বলেই তার নিজের বাসায় এনে রেখেছিল। আব্দুর রহমান তার জন্য বিপজ্জনক ভেবেই এরশাদ তাকে সেনাবাহিনী থেকে সরিয়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ দেন। আমি যেটুকু জানতে পেরেছি এরশাদ মরিয়া হয়ে উঠেছিল এই স্বীকারোক্তিগুলো পাওয়ার জন্য। আর আব্দুর রহমানও জানতো যে এই কাগজগুলো পেয়ে গেলে এরশাদের কাছে তার আর কোনো মূল্যই থাকবে না। ভাবতে অবাক লাগে যে, এই নথিপত্রগুলো আব্দুর রহমান প্যারিসে কাজে যোগদানের আগেই লাকির মাধ্যমেই প্যারিসে পাঠিয়ে দিয়েছিল এবং কাজে যোগদান করে লাকির কাছ থেকে সে কাগজগুলো বুঝে পেয়েছিল। তখন লাকিকে আবার বিয়ে করে জীবনকে নতুন করে সাজাবার স্বপ্নে বিভোর ছিল আব্দুর রহমান। প্যারিসে যোগদানের জন্য ঢাকা থেকে যাবার সময় আব্দুর রহমানের মালপত্র তন্ন তন্ন করে ঢাকা এয়ারপোর্টে খুঁজেছিল এরশাদের পাঠানো ডিজিএফআই। তারা পাগলের মতো খুঁজছিল সেই স্বীকারোক্তির কাগজপত্র। আব্দুর রহমান এতে দারুণ ক্ষুব্ধ হলেও তার করার কিছু ছিল না। আব্দুর রহমানের সঙ্গে মুজিব নামের এক সেনা সদস্যকে প্যারিস অ্যাম্বাসিতে পোস্ট করা হলো রহমানের বিশেষ দেহরক্ষী পদে। এটাও ছিল এরশাদের আব্দুর রহমানকে হত্যার পরিকল্পনার অংশ।

বেহরুজের ঘরে আব্দুর রহমানের এক পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। সে রহমানের সঙ্গে প্যারিসে বসবাস করতো। সে আমাকে বলেছে যে হঠাৎ প্যারিসে তার স্কুলে ড্রাইভার এসে উপস্থিত এবং সে বললো যে তার আব্বা মারা গেছেন। সে যেন এখনই স্কুল থেকে বাসায় চলে আসে। ছেলের নাম সানিয়ান। সে আমাকে বলে যে সে বাসায় গিয়ে দেখে দেহরক্ষী মুজিব প্যারিসে প্রচণ্ড শীতে তার আব্বার বাথরুমে কাপড় চোপড় পরে গোসল করছে। আর আব্দুর রহমানের মাথার কাছে কাঠের বাক্সটা ভাঙা পড়ে আছে যার মধ্যে ছিল ১৮ জন ফাঁসির আসামির স্বীকারোক্তি। ওর আব্বার মাথার ঘন চুল সব পড়ে ছিল বালিশের উপর। মুখটা ছিল কিঞ্চিৎ খোলা। আর উপরের পাটির সামনের দুই দাঁতের মধ্যে একটা ছোট্ট ক্ষত আর একবিন্দু রক্ত।সানিয়ান আমাকে নিজে বলেছে যে, সে স্কুল থেকে বাসায় আসার আগেই লন্ডন থেকে প্যারিস পৌঁছে যায় ব্রিগেডিয়ার এনাম। আর সে-ই মাথার কাছের কাঠের সিন্দুক ভেঙে ট্রাইব্যুনালের কাগজপত্র সঙ্গে নিয়ে যায় এবং সেগুলো পরে পাঠিয়ে দেয় এরশাদের কাছে। এরশাদ প্রীত হয়ে তাকে ব্রিগেডিয়ার থেকে একদিনের জন্য মেজর জেনারেল পদে উন্নীত করেছিলেন। আর রিটায়ার্টমেন্টের সঙ্গে সঙ্গেই এনাম এবং মুজিব রহস্যজনকভাবে মৃত্যুবরণ করেন।

আব্দুর রহমানের মৃতদেহ পোস্টমর্টেম করতে দেয়নি প্যারিসের বাংলাদেশ অ্যাম্বাসি। অথচ বিদেশে যে কোনো অপঘাতে মৃত্যু হলে পোস্টমর্টেম করানো বাধ্যতামূলক। মরদেহ ঢাকায় এসে পৌঁছালো সকাল বেলায় একটি কফিনের মধ্যে তালা দেয়া অবস্থায়। আব্দুর রহমানের আম্মা ছেলের লাশ দেখার জন্য অনেক মিনতি করলেন সেনা কর্মকর্তাদের কাছে। কিন্তু ব্রিগেডিয়ার ইমতিয়াজ কিছুতেই কফিন খোলার অনুমতি দিলেন না। আমি যখন ব্রিগেডিয়ার ইমতিয়াজকে অনুরোধ করলাম তিনি বললেন, অর্ডার নেই। এই অর্ডার কার তা বুঝতে কারোরই অসুবিধা হলো না। একটু পরে আর্মির ভ্যানে আব্দুর রহমানের লাশ নিয়ে যাওয়া হলো এয়ারপোর্টে এবং যেখান থেকে হেলিকপ্টারে নোয়াখালীর কালিহাতী থানায় পারিবারিক গোরস্থানে আব্দুর রহমানকে সমাহিত করা হয়। আমরা কালিহাতীতে তার পাঁচজন বাল্যবন্ধু একটি মাইক্রোবাসে আব্দুর রহমানের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম।